৭৬ হাজার স্বপ্নের ঠিকানা: শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের গল্প

বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার মানচিত্রে কিছু প্রতিষ্ঠান শুধু একটি বিশ্ববিদ্যালয় নয়, বরং একটি স্বপ্নের নাম। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (SUST) তেমনই একটি নাম। প্রতি বছর হাজার হাজার শিক্ষার্থী এই ক্যাম্পাসে পড়ার স্বপ্ন দেখে, কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণের সুযোগ পায় খুব অল্পসংখ্যক মানুষ।

সাম্প্রতিক ভর্তি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রায় ৭৬ হাজার আবেদনকারীর মধ্যে মাত্র ১,৪৪৮ জন শিক্ষার্থী SUST-এ ভর্তির সুযোগ পেয়েছে। অর্থাৎ, বিশ্ববিদ্যালয়টির অ্যাডমিশন রেট মাত্র ১.৯০ শতাংশ। এই সংখ্যা শুধু প্রতিযোগিতার কঠিন বাস্তবতাই তুলে ধরে না, বরং দেশের শিক্ষার্থীদের কাছে SUST-এর গ্রহণযোগ্যতা ও মর্যাদারও প্রমাণ দেয়।

ছোট শুরু, বড় যাত্রা

১৯৯১ সালে বাংলাদেশের প্রথম বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে যাত্রা শুরু করে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। তখন ছিল মাত্র ৩টি বিভাগ, ১৩ জন শিক্ষক এবং ২০৫ জন শিক্ষার্থী।

তিন দশকেরও বেশি সময় পরে সেই ছোট প্রতিষ্ঠানটি আজ একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে ৩২০ একরজুড়ে বিস্তৃত এই ক্যাম্পাসে রয়েছে ২৭টি বিভাগ, ৭টি অনুষদ এবং প্রায় ৯ হাজার শিক্ষার্থী।

এই অগ্রযাত্রা শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়নের গল্প নয়; এটি বাংলাদেশের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষার বিকাশেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

সাফল্যের সীমা যেখানে দেশের গণ্ডি পেরিয়ে যায়

একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত পরিচয় তার প্রাক্তন শিক্ষার্থী এবং তাদের অর্জনের মধ্যেই ফুটে ওঠে। SUST-এর ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম নয়।

এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের দক্ষতার স্বাক্ষর রেখেছেন। কেউ গবেষণায় বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন, কেউ প্রযুক্তি খাতের শীর্ষ কোম্পানি Meta, Google এবং Microsoft-এ কর্মরত। আবার কেউ উচ্চশিক্ষা ও গবেষণায় বিশ্বের অন্যতম সেরা প্রতিষ্ঠান Oxford-এর সঙ্গে যুক্ত।

এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অর্জন NASA-সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতাতেও বাংলাদেশের নাম উজ্জ্বল করেছে। এসব সাফল্য প্রমাণ করে, একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শক্তি শুধু তার ভবনে নয়, বরং তার শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের মেধা, পরিশ্রম এবং উদ্ভাবনী চিন্তায় নিহিত।

আখালিয়ার সবুজ পথে গড়ে ওঠা স্বপ্ন

সিলেটের আখালিয়ার সবুজ কিলোরোড ধরে হাঁটলে যে ক্যাম্পাস চোখে পড়ে, সেটি শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়। এটি হাজারো তরুণ-তরুণীর ভবিষ্যৎ গড়ার কর্মশালা।

প্রতিটি ক্লাসরুম, প্রতিটি ল্যাবরেটরি, প্রতিটি লাইব্রেরি কর্নারে লুকিয়ে আছে অসংখ্য স্বপ্নের গল্প। কেউ প্রথম প্রজন্মের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী, কেউ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে উঠে এসে নিজের জীবন বদলে দেওয়ার সংগ্রামে নেমেছে।

এই কারণেই SUST শুধু একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম নয়; এটি সম্ভাবনা, অধ্যবসায় এবং আত্মবিশ্বাসের প্রতীক।

কেন SUST এখনও বিশেষ?

বাংলাদেশে বর্তমানে অনেক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থাকলেও SUST-এর অবস্থান এখনও অনন্য। কারণ এটি ছিল পথপ্রদর্শক। দেশের প্রথম বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে এটি যে ধারা শুরু করেছিল, তা পরবর্তীতে দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাকে নতুন দিকনির্দেশনা দিয়েছে।

শিক্ষার মান, গবেষণার পরিবেশ, শিক্ষার্থীদের সাফল্য এবং প্রাণবন্ত ক্যাম্পাস সংস্কৃতি—সবকিছু মিলিয়ে SUST আজও দেশের মেধাবী শিক্ষার্থীদের অন্যতম আকাঙ্ক্ষিত গন্তব্য।

শেষ কথা

৭৬ হাজার আবেদনকারীর মধ্যে মাত্র ১,৪৪৮ জনের সুযোগ পাওয়ার গল্প আসলে সংখ্যার গল্প নয়। এটি স্বপ্ন, পরিশ্রম, অধ্যবসায় এবং সম্ভাবনার গল্প।

১৯৯১ সালে ছোট পরিসরে শুরু হওয়া একটি বিশ্ববিদ্যালয় আজ হাজারো শিক্ষার্থীর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিচ্ছে। আর সেই কারণেই শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় শুধু সিলেটের গর্ব নয়, বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার অন্যতম সফল অধ্যায়।

SUST-এর ইতিহাস, অর্জন, ক্যাম্পাস জীবন এবং আরও অনেক অজানা গল্প জানতে The Sylhet Buzz-এর সম্পূর্ণ ভিডিওটি দেখে আসতে পারেন। এই লেখাটি বিশ্ববিদ্যালয়টির গল্পের একটি সংক্ষিপ্ত পরিচয় মাত্র; ভিডিওটিতে তুলে ধরা হয়েছে আরও বিস্তারিত তথ্য, স্মৃতি এবং এমন কিছু দিক, যা অনেকের কাছেই এখনও অজানা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top